কিভাবে বই পড়তে হয় By অপূর্ব চৌধুরী


গাদা গাদা বই পড়াকে জ্ঞানী লোক বলে না । বই পড়লেই জ্ঞানী হয়না । জ্ঞানের অন্য নাম প্রশ্ন । যেখানে প্রশ্ন নেই, সেখানে জ্ঞান নেই । যেখানে কৌতুহল, তার সন্ধানই জ্ঞান ।

জ্ঞানের শুরু প্রশ্ন । জ্ঞানের উত্তরও প্রশ্ন । কারণ, একটি প্রশ্নের উত্তর আরেকটি প্রশ্নের জন্ম । আর এই পরম্পরায় যে বোধের জন্ম হয় – সেটার নাম জ্ঞান ।

দেশী লোকজন বই পড়তে জানে না । অন্তত আমার দেখা । দেশী শিক্ষিত কিংবা বুদ্ধিজীবী নামধারীগুলো টিভি কিংবা মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিতে অথবা অনলাইনে লাইভ করতে ঘরের কোনায় যে সমস্ত বইপত্র আছে বা সেলফ থাকে, তার আশপাশটা বেছে নেয়, এই জন্য দেখাতে যে – তিনি দেখাতে চান তিনি অনেক বই পড়েন । মাথার পিছনে বইয়ের ভারিক্কি দেখিয়ে বোঝাতে চান উনি বইয়ের ভারের চাপে জ্ঞানের বটবৃক্ষ হয়ে গেছেন । যদিও একেকজন আস্ত এক একটি ভাঁড় । কিন্তু যখন কথা বলেন, যখন পৃথিবী সম্পর্কে বিশ্লেষণ এবং বোধকে তুলে ধরেন, তখন মনে হয় ওনাদের ভেতরটা আর সদরঘাটের কলা বিক্রেতার ভেতরটা একই রকম শোনায় । দেখানো বইয়ের কোন রিফ্লেকশন নেই আদতে ।

পড়লেই হয় না । পড়াটা হলো খড়ের গাদা তৈরি করা । তথ্যের সমাবেশ মাত্র । পড়ার পর বোঝাটা হল সেই খড় দিয়ে আগুন জ্বালাবেন নাকি গোখাদ্য করবেন, কি করবেন তা ঠিক করা ।

লোকজন বইয়ের লিস্ট চায় । লিস্ট ধরে বই পড়ে বেকুবেরা । জ্ঞান পরীক্ষা পাসের খাতা নয় । জ্ঞান হলো নিজের সাথে নিজের বোধের পরীক্ষা ।

বই পড়ার প্রথম শর্ত নিজের ভিতরে প্রশ্ন তৈরি হওয়া । উত্তরের সন্ধানেই তিনি বই খুঁজে নেবেন । যে বিষয়ে তিনি জানতে চান, যে বিষয়ে তার কৌতুহল, যে বিষয়ে তার প্রশ্ন, যে বিষয়ে তার আগ্রহ, যে বিষয়ে তার ভালোলাগা, যে বিষয়ে তিনি কিছু করতে চান, যে বিষয়ে কিছু লিখতে চান, এমন ভালোলাগা-প্রশ্ন-কৌতুহল তৈরি হলে অটোমেটিক্যালি সেই মানুষটি সঠিক বইয়ের সন্ধান করে নেবে । বেকুবের মতো একগাদা লিস্ট ধরে কারিকুলামের মতো বই পড়ে নেয়া ঠিক অনেকটা পরীক্ষা পাশের প্রস্তুতি নেয়া, আর অন্যের কাছে কিছু বইয়ের লিস্ট তুলে ধরে বলা – আমি এই এই বই পড়েছি । কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, এই এই বইটি কি জন্য পড়লেন, তার কোন উত্তর তিনি করতে পারেন না । প্রশ্নহীন তথ্য কেবল এলোমেলো সঞ্চয়, দিনশেষে সময়ের অপচয় ।

প্রথমে যা জানতে ইচ্ছে হয় – সেই বিষয়টি ঠিক করা । তারপর সেই বিষয়ে ইন্ত্রডাক্টরি বই খুঁজে নেয়া । তারপর সেই ইন্ট্রোডাকটরি বই পড়ে তার ভিতর আরো নতুন বিষয়বস্তু খুঁজে পাবেন, যেগুলো তাকে উৎসাহিত করবে, একই সাথে কৌতুহলী করবে, তখন অন্য আরো বই গুলো খুঁজে নেয়া ।

এইভাবে ধাপে ধাপে একটি মানুষ তার ভালোলাগার সিঁড়িতে পা দিয়ে ধীরে ধীরে বোধের মিনার তৈরি করে । বই হয় সেখানে তার মই ।



September 26th, 2021