পথের কথা By অপূর্ব চৌধুরী


হাইকিং করতে কখনো ড্রাইভ করি না । কারণ, লঙ ডিসটেন্স হাইক করি বলে যেখান থেকে শুরু করি সেখানে ফিরে আসার পথ থাকে না । আবার লুপ হাইকিং বা বৃত্তাকার হাইকিং করলে ঝামেলা হলো ছয় সাত ঘণ্টা হাঁটার পর ড্রাইভ করা মানে মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসা । শরীরে এক বিন্দু শক্তি থাকে না । এমনকি সাইকেল নিয়েও হাইকিং যাবেন না । যখন হাইকিং করবেন, যত বোঝা কম নেবেন, যত রিলাক্স থাকতে পারেন । এই যেমন কাল ফেরার পথে শেষ দুর্ঘটনা – এতই ক্লান্ত ছিলাম, ঘুমের ঠেলায় ট্রেনের টেবিলে একবার, উইন্ডোতে আরেকবার মাথা বাড়ি খেয়েছে । কপাল ফুলেছে একটু, কেবল কেউ বরফ লাগিয়ে দেবার নেই । মুখ হা করে ঘুমাচ্ছিলাম, আরেকটু হলে যেখানে নামার কথা, সে স্টেশন মিস করতাম ।

ভ্রমণ মানে তো কিছু ঘটনা । না হলে কিছু মনে থাকবে না । আমি দুর্গম জায়গা গুলোতে বেশি যাই । যেখানে কাক পক্ষী যায় কম, মানুষ বসতি নেই, যেখানে যাওয়াটাও একটা মজার । কষ্ট করে কোথাও পৌঁছানোটাও ভ্রমণের আনন্দ ।

ভ্রমণ মানে শুধু দেখা নয়, পুরো যাত্রাপথের উপলব্ধিটাই ভ্রমণ ।

যেমন : কাল যাওয়ার পথ কতবার গাড়ি চেঞ্জ করতে হয়েছে । বাড়ি থেকে বের হয়ে কাছের এক আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন স্টেশনে হেঁটে গেলাম বিশ মিনিটে । ট্রেনে পনেরো মিনিটে বড়ো স্টেশনে এসে পৌঁছলাম । এখন মূল ট্রেন ধরতে হবে । চেক করে দেখি যে জায়গায় যাবো তার প্রথম ট্রেন আরও দেড় ঘণ্টা পরে । ভুলটা আমার । হোম ওয়ার্ক করার সময় ট্রেনের যে টাইম চেক করেছিলাম ওটা ছিল সপ্তাহের ওয়ার্কিং ডে টাইম । আজকে তো ছুটির দিন । এখানে ছুটির দিনে বাস ট্রেনের টাইম থেকে টিকেট পরিবর্তন হয়ে যায় । এসেই যখন পড়েছি কি আর করা ।

ভোর চারটায় উঠেছিলাম । চোখে ঘুম । সোজা যাত্রী বেঞ্চিতে মাথার নিচে ব্যাগ দিয়ে লম্বা হয়ে একটা ঘুম দেয়ার চেষ্টা করলাম । আমার লজ্জা কম এসবে । দেখতে লাগছিল লঞ্চের বেঞ্চিতে ঘুমানোর মতো ।

পনেরো বিশ মিনিট ঘুমানোর চেষ্টার পর মনে হলো – বিকল্প আছে কিনা দেখি । পুরো ইংল্যান্ড চষে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে । জটিল ট্রেন রুট ভালোই চিনি । ডিসপ্লে বোর্ড থেকে বের করলাম আরেকটা রুটে সেখানে যেতে পারি । দেখলাম, দশ মিনিট পরেই সে ট্রেন । কফি আর ব্যগেট নিয়ে দৌড়ে গেলাম নির্ধারিত প্লাটফর্মে ।

ট্রেনে যেতে লাগলো দেড় ঘণ্টা । স্টেশন থেকে বের হয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটতে হলো বাস স্টপেজ বের করতে । আগে থেকে বাস নাম্বার জানতাম । এবার ভাগ্য অনেক প্রসন্ন । স্টপেজে আসতেই দু মিনিট পর বাস এলো। এটা মিস করলে পঁচিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা । এদেশের অনেক বাস স্টপে সিট থাকে না বসার । অন্য সময় ফুলবাবু হয়ে থাকলেও ভ্রমণের সময় আমার লজ্জা কম । দরকার পড়লে কুলিদের মতো মাটিতে বসে পড়ি যেখানে সেখানে । ভ্রমণ মানেই তো পথেই রাত, পথেই কাত । আসে পাশে ইংরেজ যাত্রী গুলো তখন এমন ভাবে তাকায় – যেনো লরির ভিতরে করে অবৈধ ভাবে এদেশে এসেছি, ঘর বাড়ি নাই, রিফিউজি । আমি মিটি মিটি হাসি ।

বিশ মিনিট পর আরেকটি স্টপেজে নামতে হলো । সেখান থেকে পাঁচ মিনিটের আরেকটি স্টপেজে যেতে হবে রাস্তার অপজিটে । আরেকটি বাসে উঠতে হবে । সেটা যেতে লাগবে চল্লিশ মিনিট । দুর্গম জায়গায় এই বাসটি যায় । প্রতি ঘন্টায় একটি । বিকেল পাঁচটায় শেষ বাস । কিন্তু দিনের প্রথম বাস আসতে আরো আধা ঘন্টা । রাস্তায় মানুষজন নেই, গাড়িও নেই । কোনো যাত্রী ছাউনী নেই । একটা ল্যাম্পপোস্ট আর একটা টাইম টেবিল দেয়া নোটিশ বোর্ড । যথারীতি আইল্যান্ডে পাছা দিয়ে বসে পড়লাম রাস্তায় । কে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ।

আধা ঘন্টা পর টাইম মতো বাস এলো । অপেক্ষমান যাত্রী একমাত্র আমি, বাসের ভেতরও একমাত্র যাত্রী আমি । গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছিলাম কোথায় নামতে হবে সেটা বুঝতে । তখন বেল টিপতে হবে । না হলে বাস থামবে না ।

একটু ঘুম দিলাম । পথ আধাআধি যেতে ম্যাপে চোখ দিতেই দেখি, আমার হাই লাইটেড করা ম্যাপের বিপরীত গাড়ি ছুটছে । চোখ কপালে উঠলো । প্রমাদ গুনলাম । হায় হায় ভুল বাসে উঠেছি নাকি । আবার চেক করলাম, আমার রুট ম্যাপ বলছিলো এটাই একমাত্র বাস । কিন্তু গন্তব্যের বিপরীত দিকে ছুটছে কেনো ।

দৌড়ে ড্রাইভারের কাছে গেলাম । কাঁচের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম নেক্সট ট্রাফিকে কখন সে থামবে । জিজ্ঞেস করলাম, স্টপেজে নাম, যেখানে যাচ্ছিলাম, বাস কি সেখানেই যাচ্ছে কিনা । হাতে ফোন, স্ক্রিনে গুগল ম্যাপ, সেটার দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার হাসি দিয়ে বললো – হা, ঐদিকেই যাচ্ছি, তবে ভিন্ন পথে ।

নিজেই হাসলাম সিটে এসে । ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম, বাস অনেক ঘুরে আরেকটি পথে সে দিকেই যাচ্ছে । অচেনা জায়গায় কিছু না জানলে পলে পলে মনে হয় – এই রে হারিয়ে গেলাম মনে হয় ! অবশ্য ভ্রমণে হারাতেই আনন্দ ।

স্টপেজে নেমে দেখি সামনে বিশাল বিশাল পাহাড় । কোনদিকে যাবো । কোনো রাস্তা নেই । ইংল্যান্ডের একেবারে দক্ষিণের শেষ মাথা এটি । পাহাড়ের ওপারেই সমুদ্র । রুট নেভিগেশন শুরু করার স্পট সেখান থেকে আরো বিশ মিনিটের পথ । রুট তাই বলছে কিছু ডট সাইন দিয়ে । এখন এই ডট ধরে রাস্তা বের করতে হবে । কিন্তু কোন দিকে যাবো বুঝতে পারছি না । পিটি প্যারেডের মতো একবার ডানে ঘুর, আরেকবার বায়ে ঘুর করছিলাম । একটু হাঁটতে একটি ট্রেক পেলাম । ঘাসের ঝোপের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে । বুঝলাম – এই পথই হবে । ট্রেক পেয়ে খুশি । এখন আর ম্যাপ লাগবে না । শুরু করি ট্রেকিং । এক চুমুক পানি খেয়ে শুরু করলাম দিনের হাইকিং ।



September 12th, 2021