ভাষার বৈচিত্র্য এবং বাংলা ভাষা Dr. Opurbo Chowdhury. London, England


পৃথিবীতে ভাষা আছে সাত হাজারের উপরে । সবচেয়ে প্রাচীনতম লিখিত ভাষার বয়স সাড়ে পাঁচ হাজার । নাম : সুমারিয়ান । বর্তমান ইরাক অঞ্চলে তার অস্তিত্ব ছিল । কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত আছে এমন ভাষার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা তামিল । প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ।

শুধু এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি ভাষার জন্ম । প্রায় ২৩০০ র বেশি । এর পরে আছে আফ্রিকায় হাজার দুয়েকের উপরে ভাষা । ইউরোপে জন্ম নেয়া ভাষার সংখ্যা তিনশোর বেশি মাত্র !

অনেকে মার্কিন ইংরেজি নিয়ে বড়াই করে । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর আমেরিকান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং বিমানের পাইলটদের সবাই একই ভাষা বুঝার সুবিধা ছাড়া ভাষায় আমেরিকান ইংলিশের অবদান খুব কম । সাহিত্যে তথৈবচ ! বর্তমানে কম্পিউটার জায়গা করে নিয়েছে ইংরেজি, তবে তা একা আমেরিকান ইংরেজি নয় ।

আমেরিকার জনসংখ্যা ত্রিশ কোটির উপরে হলেও মাত্র বিশ কোটির বেশি মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি । আমেরিকায় দ্বিতীয় সবচেয়ে বড়ো ভাষা স্প্যানিশ । মাতৃভাষার সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চাইনিজ ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলে । দ্বিতীয় স্প্যানিশ এবং তৃতীয় ইংরেজি ।

সারা পৃথিবীতে ইংরেজিতে মাতৃভাষার সংখ্যা চল্লিশ কোটির বেশি নয় । সেখানে স্প্যানিশ মাতৃভাষা পঞ্চাশ কোটির বেশি । পৃথিবীর ৮% লোকের প্রথম ভাষা স্প্যানিশ । ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে প্রথম স্প্যানিশ, তারপরে পূর্তগীজ ।

ইংরেজি ভাষায় দেড় বিলিয়ন মানুষ yes, no, very good ধরনের ইংরেজি বলতে পারে । কেউ স্যংখ্যাটিকে দুই বিলিয়ন দাবি করে । সে হিসাবে পৃথিবীর ২০% থেকে ২৫% মাত্র । প্রতি পাঁচ জনে একজন ! আঠারোশো শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জার্মান ভাষা তাদের মাতৃভাষা হওয়ার কথা ছিল । ১৭৯৫ সালে কংগ্রেসে এক ভোটাভুটি হয়েছিল ! তাতে জার্মান ভাষা মাত্র এক ভোটে হেরে যায় ইংরেজির কাছে । ইংরেজি হয়ে ওঠে আমেরিকার প্রধান ভাষা । তবে মজার হলো – এখনো পর্যন্ত আমেরিকার কোনো State Language নেই সংবিধান অনুযায়ী । আমেরিকা একটি বহুজাতিক ভাষার দেশ । পূর্ব থেকে থাকা নেটিভ রেড ইন্ডিয়ানদের পরে সতেরো শতকে প্রথম ডাচ এবং জার্মানরা আসে । তারপরে আসে ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চরা । বর্তমানে গোটা আমেরিকায় ৩০০ র বেশি ভাষায় কথা বলার লোক আছে । বাহিরে ইংরেজি ভাষা হলেও সেখানে ঘরের ভাষা বহুজাতিক । তবে শুধু লন্ডন শহরেই তিন শতাধিকের উপর বহুভাষিক অধিবাসীর বসবাস । লন্ডন পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্রময় বহুজাতিকের শহর ।

ইংরেজির ভাষার জনক ব্রিটিশ রা হলেও আমেরিকানরা ব্রিটিশদের তিনগুন বেশি ইংরেজি ভাষায় কথা বলে । ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষিক মাত্র ৬ কোটি, আমেরিকান ইংরেজি মাতৃভাষা ২০ কোটির বেশি, সারা পৃথিবীতে ইংরেজি মাতৃভাষা ৪০ কোটির বেশি । শুনতে অবাক লাগলেও আমেরিকার পরে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ ইংরেজি মাতৃভাষার দেশ নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড নয় । নাইজেরিয়াতে আট কোটির বেশি লোকের মাতৃভাষা ইংরেজি !

ইংরেজির পর পৃথিবী জুড়ে শিক্ষিত লোকেরা সবচেয়ে বেশি জানে ফ্রেঞ্চ ভাষা । ব্রিটেনের বাহিরে ইউরোপে ফ্রেঞ্চ হলো লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা অফ ইউরোপ ! পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ফ্রেঞ্চ ভাষিক প্যারিস প্রথম হলে, দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলে কঙ্গোর কিনসাসা শহরের লোকেরা !

বিশ্বে ইংরেজি ভাষার বিস্তারে উনিশ শতক পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ ব্যবসা এবং বিশ শতকের অর্ধেকের পর ফিল্ম, মিডিয়া এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে আমেরিকান ইংরেজি সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে । বর্তমানে কম্পিউটারের দুই তৃতীয়াংশ তথ্য ইংরেজি ভাষায় লেখা । মজার হলো ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার ভাষা ইংরেজি হলেও তাদের রাষ্ট্রীয় motto ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা ।

ইংরেজি ভাষার মূল উৎপত্তি ইংল্যান্ডে নয় । পনেরোশো বছর আগে পশ্চিম জার্মানের Angels নামক একটি জাতি জার্মানির পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে গিয়ে একসময় বর্তমান ইংল্যান্ডে এসে বসবাস করতে শুরু করে । তাদের ভাষা ছিল জার্মান ভাষার একটি ডায়ালেক্ট – Anglo Frisian । তখন ইংল্যান্ডের লোকজন যে ভাষায় কথা বলতো তার নাম ছিল Celtic । এই Angels থেকেই English এবং England এসেছে ! আমরা বাংলা করেছি ইংরেজ ! ইংরেজির মূল উৎপত্তি জার্মান হলেও ইংরেজি ভাষার এক তৃতীয়াংশ শব্দ ফ্রেঞ্চ । কারণ, ফ্রেঞ্চ রা চারশো বছর ইংল্যান্ডের কিছু অঞ্চল শাসন করেছিল ।

ইংরেজির দেশ ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টরিয়া ইংরেজি ভাষা জানতেন খুব কম । কারণ তিনি ঘরে জার্মান ভাষায় কথা বলতেন এবং দরবার চালাতেন জার্মান ভাষায় ! রানী ভিক্টরিয়ার মা ছিল এক জার্মান বিপত্নীক । বর্তমান রানী এলিজাবেথের দ্বিতীয়র স্বামী ফিলিপ বাপের দিক থেকে গ্রিক, দাদার দিক থেকে ডেনিশ এবং নানার দিক থেকে জার্মান । জন্মেছেন গ্রীকে, পড়ালেখা করেছেন ফ্রান্সে, কাজ করেছেন ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে এবং রাজা হয়েছেন এলিজাবেথকে বিয়ে করে ব্রিটেনে ! বহুজাতিক রাজা !

নেটিভ স্পিকারের সংখ্যায় বাংলা ভাষা চতুর্থ নাকি পঞ্চম – এ নিয়ে হিন্দির সাথে দ্বন্দ্ব আছে । কোনো হিসাবে হিন্দি চতুর্থ বড় ভাষা, বাংলা পঞ্চম । কারো হিসাবে উল্টো । কারণ, প্রথম ভাষা হিসাবে হিন্দি কমছে, কিন্তু বাংলা প্রথম ভাষা বাড়ছে ।

একশো বছর আগে সারা ভারতে বাংলায় কথা বলার লোক ছিল চার কোটির উপরে । মজার হলো – সমসাময়িক কালে হিন্দি ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার চেয়েও কম ছিল । বিশ শতকের অর্ধেকের পর পুরো ভারতে হিন্দির দৌরাত্ব বেড়ে যায়, পশ্চিমবঙ্গে বাংলার প্রভাব কমে যায়, কিন্তু উর্দু এবং ফার্সীকে বিদায় করে বাংলাদেশে বাংলা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় । বর্তমানে সারা পৃথিবীতে আটাশ কোটির বেশি অধিবাসীর ঘরে বাংলা মাতৃভাষা । তার দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে ।

প্রতি বছর ভাষা কমে যায় । কারণ, সে ভাষায় একজনও বলার মতো থাকে না । সবচেয়ে কম কথা বলা ভাষা ক্যামেরুনের Busuu ভাষা । মাত্র তিনজন কথা বলতে পারে এই ভাষায় । সবচেয়ে বেশি ভাষা আছে পাপুয়া নিউগিনি তে । প্রায় ৮০০ এর উপরে ভাষা দ্বীপ দেশটিতে ।

পৃথিবীর অর্ধেক লোক মাত্র ২৩ টি ভাষায় কথা বলে । আবার চার বিলিয়নের উপরে মানুষ দুটি ভাষায় কথা বলতে পারে । পৃথিবীর জনসংখ্যা আট বিলিয়নের মতো ।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অনুবাদ হয়েছে বাইবেল । প্রায় ছয়শোর বেশি ভাষায় অনূদিত । তিন হাজারের উপরে ভাষায় বাইবেলের অংশবিশেষ অনুবাদ করা হয়েছে । কোরআন অনুবাদ করা হয়েছে পঞ্চাশটির মতো ভাষায় মাত্র । কোরআনের অংশ বিশেষ আয়াত অনুবাদ করা হয়েছে ১১০ টি ভাষায় । শুনতে অবাক লাগলেও নবম শতাব্দীতে সম্পূর্ণ কোরআন প্রথম অনুবাদ করা হয় গ্রীক ভাষায় ।

সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা বলা হয় ফ্রেঞ্চ ভাষাকে । দ্বিতীয় স্থান নিয়ে বাংলা এবং ইতালিয়ান ভাষার লড়াই । আবার সবচেয়ে দ্রুত বলা ভাষা জাপানি এবং সবচেয়ে আস্তে বলা ভাষা চাইনিজ ম্যান্ডারিন ।

গ্রীক ভাষার প্রথম দুটি বর্ণমালার নাম আলফা এবং বেটা । দুটো মিলে ইংরেজি Alphabet বা বর্ণমালা শব্দটি এসেছে ! বাংলা বর্ণমালা ২৮ টি । সবচেয়ে বেশি বর্ণমালা আছে কম্বোডিয়ার খেমার ভাষায় । ৭৪ টি । সবচেয়ে কম পাপুয়া নিউগিনির রোটকাস ভাষায় মাত্র ১১ টি বর্ণমালা ।

ভারতে প্রায় চারশোর বেশি ভাষা আছে । তার মধ্যে হিন্দি এবং ইংরেজি রাষ্ট্রের অফিসিয়াল ভাষা । ২০ টি ভাষা স্টেটগুলোর প্রধান অফিসিয়াল ভাষা । রাষ্ট্র হিসাবে জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল ভাষা সবচেয়ে বেশি – ১৬ টি । তারপরে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার ১১ টি । ইতালিয়ানদের রাষ্ট্রীয় ভাষা ইতালিয়ান নয় । ফ্লোরেন্টিন নামের একটি আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট তাদের রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল ভাষা ।

ইংরেজির মূল জনক ব্রিটেনে ইংরেজির ভাষার ৪০ টি ডায়ালেক্ট আছে । আমেরিকায় আছে ২৪ টি । বইয়ের ভাষায় বাংলা ডায়ালেক্ট ছয়টি । যদিও জেলার হিসাবে আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট অনেকগুলো ।

সবচেয়ে বেশি শব্দ ইংরেজি ভাষায় । এক লক্ষ সত্তর হাজারের উপরে । দ্বিতীয় রাশিয়ান ভাষার শব্দ সংখ্যা দেড় লক্ষের উপরে । তৃতীয় কোরিয়ান ভাষা ।

বাংলা ভাষার শব্দ সংখ্যা নিয়ে ভালো গবেষণা এবং সঠিক তথ্য নেই । এই ভাষার মানুষগুলোর মতো নিজেদের ইচ্ছামতো এক একটি দাবি করে বসেছে । কেউ আজগুবি দাবি করে – এক লক্ষর উপরে, কেউ দেড় লক্ষ । সবগুলোই মামুর বাড়ির আবদার ! বাংলায় প্রকাশিত ডিকশনারিগুলোতে গড়ে পঁচাত্তর থেকে আশি হাজার বাংলা শব্দ থাকে । যার একটি ভালো অংশ অব্যবহৃত, অপ্রচলিত এবং পরিবর্তিত । একটি আপাত হিসাব হচ্ছে তদ্ভব বা খাঁটি দেশি শব্দ চল্লিশ হাজারের মতো, তৎসম বা সংস্কৃত থেকে গ্রহণ করা শব্দ বিশ হাজার এবং বাকিগুলো বিদেশী বা অন্য ভাষা থেকে নেয়া ।

ইংরেজি ভাষায় কথা বললে বাম মস্তিষ্ক কাজ করে । কিন্তু চাইনিজ ভাষায় কথা বললে বাম এবং ডান, দুই মস্তিষ্ক কাজ করে । বেশির ভাগ ভাষার ক্ষেত্রে বাম মস্তিষ্কই কাজ করে । কারণ, মানুষের ল্যাংগুয়েজ সেন্টার থাকে মস্তিষ্কের বাম পাশে । নাম Broca’s area ।



February 21st, 2021