মুক্ত চিন্তার পথিক By অপূর্ব চৌধুরী


লেখালেখির বয়স এখনো হামাগুড়ি । অনেক দেরিতে লেখায় হাত দিয়েছি । বিশেষ করে বাংলায় । বলতে দ্বিধা নেই, পড়ার ভাণ্ডার ইংরেজিতে, লিখি আমি বাংলায় । যদিও এখন দু’ ভাষাতেই লিখি । ইংরেজি আমার আয়েশের জায়গা নয়, ইংরেজি আমার পড়ার জায়গা । ইংরেজিতে কেতাদুরস্ত হওয়ার অভিরুচিও নেই; কারণ, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাকে আমি ভালোবাসি, বাংলায় আমার সহজপটুতা । ইংরেজের দেশে পেটের দায়ে কাজ করি । ইংরেজি কাজের ভাষা । যেটুকু জানলে চিন্তাকে সমৃদ্ধ এবং স্বচ্ছ করতে পারি, ইংরেজির প্রস্রবণকে সে কাজেই ব্যবহার করি ।

প্রবাসে বসে ছোট্ট প্রয়াসে সাতখানা বাংলা বই প্রকাশ করেছি । লেখার বয়স মাত্র পাঁচ বছর । অন্যরা যখন হাত পাকিয়ে ফেলেছে, পাকা বয়সে আমি শুরু করেছি সবে বীজ বপন । চাষ এখনো অনেক দূরে, ফসল সে’তো অনেক তফাতে ।

এখন ইংরেজির দপদপা । ইংরেজির দাক্ষিণ্য নিলে এঁড়ে ভট্ট সাজার যুগ । সে মোহন ছেড়ে বাংলার অনুরাগ নিয়ে চলা মানে লোকের কাছে ছিটেল হয়ে যাওয়া ।

সৃষ্টি আপন বুলিতে হয়, নকলে নয় । নিজের ভাষায় ভালোলাগা থেকে করি, ভালোলাগা থেকেই লেখালেখি । ভালোলাগার ব্যাকরণ নেই, ভালো লাগছে, এটাই ভালোলাগার বড়ি । সৃজনশীল কিছু মাতৃভাষাতেই হয়, অন্য ভাষায় চেষ্টা হল – যেমন খুশি তেমন সাজায় রয় ।

কবিতা তেমন লিখি না, তবে ভেতরটা কবিতার জন্যে হাহাকার করে । পেশার রুক্ষতার কাছে নেশার মাদকতা ছুঁটে যায় । তারপরেও মাঝে মাঝে লিখি । শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসি, শব্দের বিচিত্রতায় হেঁটে হেঁটে দেখি কৌতূহলের ভৈরবী ।

তবে বেরসিক গদ্যই আমায় যুক্তির রস যোগায় । দর্শন আর সাহিত্য প্রিয় বিষয় । যদিও বিজ্ঞানের মানুষ আমি । সাথে আছে জীবন নিয়ে কৌতূহল, মন নিয়ে রহস্য । দুটোর অনুসন্ধানে মন এবং মস্তিষ্ক চলে আসে লেখায় ।

গত একবছর স্বাস্থ্য নিয়ে লিখেছি । ওটা আমার পেশা, আনন্দ করবার জায়গা নয় । আমাদের চেনা পৃথিবী হঠাৎ বদলে গিয়েছিলো । চারিদিকে মৃত্যুর ছবি । বাধ্য হয়ে জীবিকার পালকে লিখেছি দায়িত্বের লেখন । পেশা এবং নেশাকে আলাদা করে রাখি । দুটো নিজ নিজ স্বাধীন পথে চলে, আবার দুটোই পরিপূরক হয়ে একে অপরের হাত ধরে সময়ে ।

বিজ্ঞান ভালোবাসি; কারণ, দর্শনে যার মুক্তি, বিজ্ঞানে তার যুক্তি । স্বাস্থ্যের পাশাপাশি বিজ্ঞানের জট খুলতে ভালো লাগে । বিজ্ঞান কঠিন নয়, বিজ্ঞান হলো কঠিনকে সহজ করে ভাঙার ফুর্তি ।

কাব্য আমার আনন্দ, একান্ত আনন্দ । কবিতা হলো মনের নগ্নতায় ধরা দেয়া এক টুকরো হর্ষধ্বনি । কবিতা মানে নিজের ভেতর না বলা কথার ছবি । ভালোবাসি বৃষ্টি, ভালোবাসি চা, ভালো লাগে জল, ভালো লাগে জলে জলে আলোর ছায়া ।

কবি নই, তারপরেও মাঝে মাঝে পদ্য লিখি । কবিতা হলো অনুভবের একটুকরো অন্তরঙ্গ দংশন । গদ্যটুকু চিন্তার অভ্যাস, পদ্য তার আনন্দ । জীবনের কথাগুলো ছোট ছোট করে সাজাই । কখনো পদ্যের ঢং হলে নাম দেই কবিতা । হয়তো কবিতা তাই । কবিতা মানে এক পশলা বৃষ্টি, কখনো ভোরের আলোতে এক পেয়ালা চা । কবিতা যেনো প্রিয়ার মুখে এক বিন্দু ঘাম, কবিতা মানে শেষ বিকেলে উড়ে আসা চিঠির খাম ।

কাব্যে কাব্যেই ফুটে ওঠে আমার জীবন দর্শন, বিজ্ঞান ভাঙে জট, মনের ক্যানভাসে আঁকি ফটিক সকাল, গদ্যে গদ্যে বাঁধি একান্ত ভাবনা ।

আমি আহামরি কেউ নই, তবে আমি সাধারণ একজন, সাধারণের ভিড়ে থাকতেই ভালোবাসি, এতটুকু দাবি করতে পারি । সাথে বলতে পারি – মুক্ত চিন্তার অচেনা পথিক একজন ।



January 8th, 2021