করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কারা কারা নিতে পারবেন না Dr. Opurbo Chowdhury. London, England


২০২০ -এর শেষের দিকে চলে এসেছে বিশ্ব । এই বছর করোনা ভাইরাসের বছর । বছরের শুরু ছিল নতুন ভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা । বছরের শেষে এসে যেন মুক্তি মিলালো কিছুটা ।

তিনটি প্রধান ভ্যাকসিন সবার মুখে মুখে এখন । ফাইজার, মডার্না এবং অক্সফোর্ড । মাসের শুরুতে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম তার দেশের নাগরিকদের জন্যে অনুমোদন করেন । মডার্নার ভ্যাকসিনটি গত সপ্তাহে মার্কিন কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্যে অনুমোদন দেয় । আশা করা হচ্ছে যে বছরের শেষের দিক বা আগামী বছরের প্রথম দিকে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি ব্রিটিশ ভ্যাকসিন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাবে । সেই হিসাবে ভ্যাকসিন ইতিহাসে সর্বপ্রথম এতো দ্রুত তিনটি কার্যকরী ভ্যাকসিন একবছরের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা তৈরি করতে সক্ষম হলেন ।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৭২ টি দেশের ২০০ -এর বেশি প্রতিষ্ঠান করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যস্ত ।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সাইন্স ডিপার্টমেন্টের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান – অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ ।

আমেরিকার ব্যক্তি মালিকানাধীন বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান মডার্না, যা ২০১০ সালে Timothy Springer এবং Robert Langer সহ পাঁচজনের ইনভেস্টমেন্টে ওষুধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাবে শুরু করে ।

জার্মানির বায়োএনটেক হল Uğur Şahin এবং Özlem Türeci নামের তুরস্কের বংশোদ্ভূত জার্মান মুসলিম চিকিৎসক দম্পতির ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ২০০৮ সালে গড়ে ওঠা বায়োটেকনোলজির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ।

এই তিনটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মূল ভ্যাকসিনটি তৈরি করছে । কিন্তু তা উৎপাদনের মতো বিশাল কাজটি করছে বাকি তিনটি ওষুধ তৈরির কোম্পানি ।

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করবে ওষুধ কোম্পানি AstraZeneca, মডার্না -র ভ্যাকসিনটি করছে আমেরিকান একটি ওষুধ কোম্পানি Lonza, আর বায়োএনটেককেরটি করছে Pfizer ।

এখন পর্যন্ত সাড়ে ছয় কোটি লোক করোনায় আক্রান্ত হল । মারা গেলো পনেরো লক্ষের বেশি । প্রতিদিন পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয় ।

পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮ বিলিয়নের মতো । সুযোগ থাকলে আট বিলিয়ন লোকেরই ভ্যাকসিন দরকার । কিন্তু বাস্তবতা হল – সবাই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না । সবাইকে ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না ।

কারা কারা এই দলের মধ্যে পড়েন !

প্রথম গ্রুপ হল – যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে তাদের কোনোভাবেই কোভিড ১৯ এর ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না । অথবা অনুমোদিত দেশগুলোর ওষুধ কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ষোলো বছরের নিচে কেউকে এই ভ্যাকসিন আপাতত দেয়ার প্রয়োজন নেই । এমনকি তাদের আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকলেও । যদিও করোনার থাবা থেকে শিশু, কিশোর এবং পঁচিশের নিচে তরুণরা প্রাকৃতিক এবং শারীরিক কিছু কারণে বেঁচে গেছে এবং তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ কিংবা আক্রান্ত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষণহীন, উপসর্গহীন অথবা মৃদু আক্রান্ত ।

১৬ বছরের নিচে কেউকে এধরনের ভ্যাকসিন না দেয়ার পেছনে প্রধান কারণ হল – ভ্যাকসিনগুলো বানানো এবং পরীক্ষার সময় কমপক্ষে আঠারো থেকে আশি বছরের নারী পুরুষকে বেছে নেয়া হয়েছে ট্রায়ালের জন্যে । যে কারণে ভ্যাকসিনগুলো ষোলো বছরের নিচে কারো শরীরে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে অথবা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কেমন, গবেষণা কিংবা অনুমোদন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সে ব্যাপারে কোন গবেষণা কিংবা উপাত্ত নেই । একদিকে যেমন তাদের ভ্যাকসিনের দরকার নেই, আরেকদিকে তাদের উপর পরীক্ষা করা হয়নি ভ্যাকসিন গুলোর । স্বাভাবিক কারণে তাদেরকে এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না । তবে সামনে তাদের উপর প্রয়োগের ট্রায়াল এবং গবেষণা শেষ হলে তখন অনুমোদনের সাপেক্ষে দেয়া যাবে ।

দ্বিতীয় গ্ৰুপ হল – যারা প্রেগন্যান্ট । সকল ধরনের প্রসূতি মায়েদের জন্যে, এবং যারা আগামী তিনমাসের মধ্যে প্রেগন্যান্ট হওয়ার পরিকল্পনা রাখছেন, তারা কেউ এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন নেবেন না । এই ভ্যাকসিন একদিকে যেমন আপনার ক্ষতি করতে পারে, তেমনি আপনার অনাগত সন্তানের শরীরেও প্রভাব ফেলতে পারে । প্রসূতি মায়েরা যত মাসই হোক, কোনোভাবেই ভ্যাকসিন ঝুঁকিতে যাবেন না । উল্লেখ্য যে শিশু এবং কিশোরদের মতো প্রসূতি মায়েদেরও শারীরিক কিছু কারণে করোনার ঝুঁকি খুব কম । অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রসূতি মায়েরা করোনায় আক্রান্ত হয় না ।

যে কারণে বাচ্চাদের ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না, ঠিক একই কারণে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের উপরেও ভ্যাকসিন গুলোর ট্রায়াল করা হয় নি । তাই তাদের শরীরে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, কি ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে অথবা বাচ্চার শরীরে এবং গঠনে কোন প্রতিক্রিয়া করে কিনা, তার উপর কোন ট্রায়াল, পরীক্ষা, গবেষণা কিংবা উপাত্ত, কোনটাই কর্তৃপক্ষের হাতে নেই । শিশুদের মতো তাদেরকেও ট্রায়ালের আয়ত্তে শিগ্রই আনা হবে, যাতে করে ভবিষ্যতে তাদেরকেও ভ্যাকসিন দিয়ে প্রস্তুত রাখা যায় ।

তৃতীয় গ্ৰুপ হল – যাদের ইতিপূর্বে কোন ধরনের ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার ইতিহাস আছে, যারা ইতিপূর্বে কোন ধরনের ভ্যাকসিন দেয়ার পর এলার্জিক রি-একশনে আক্রান্ত হয়েছেন, তারা এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন দিতে পারবেন না । এ ক্ষেত্রে আরেকটি সংযুক্ত সতর্কতা হল – কোন ধরনের মেডিসিন ইতিপূর্বে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন, কোন ধরনের এন্টিবায়োটিক আপনার এলার্জি আছে, তাদেরও এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে । এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশের ওষুধ কর্তৃপক্ষ এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বলে নেবেন, যাতে করে আপনি ভ্যাকসিন রিয়াকশনের ঝুঁকির দলে পড়েন কিনা, তা অগ্রিম জানা অথবা আপনাকে সতর্কতামূলক পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব হবে ।

যে কোন ভ্যাকসিন দেয়ার আগে আপনার শরীরের সর্বশেষ অবস্থা, কি কি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ইতিপূর্বে, কোন কোন ওষুধ খাচ্ছেন বর্তমানে, পূর্বে কোন ওষুধ, ভ্যাকসিন কিংবা খাবারে রিএকশানের শিকার হয়েছেন কিনা, কোন কিছুই গোপন না করে চিকিৎসক বা ভ্যাকসিন প্রয়োগকারী ফার্মাসিস্ট, নার্স, টেকনিশিয়ান কিংবা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন ।

ভ্যাকসিন দিয়ে নিজেকে সুরক্ষা করতে গিয়ে শরীরকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলবেন না ।

অপূর্ব চৌধুরী । চিকিৎসক এবং লেখক ।

দৈনিক আলোকিত সকাল : ২২.১২.২০২০

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কারা কারা নিতে পারবেন না
ডা. অপূর্ব চৌধুরী



December 30th, 2020